সুলতানা জেসমিন জুই
ফেসবুকের ওয়ালে দেখলাম অনেকেই ঢাকায় বস্তিতে থাকা বরিশালের সংখ্যা নিয়ে ফৃবেশ ট্রল করছেন। যদিও এসব পরিসংখ্যানের মেথডলজি, স্যাম্পল সাইজ বা টার্গেট এরিয়া নিয়ে কোথাও কোন আলোচনা নাই, তাই আপনাদের মত আমিও সেসব আলোচনায় না গিয়ে সরাসরি আপনাদের মতোই মুল কথায় চলে যাই।
আক্ষরিক অর্থে শুধু বরিশাল ই নয় আমাদের কত শতাংশ আসলে বস্তিতে বসবাস করি চাইলে নিজেদের জীবন থেকে একটু হিসেব মিলিয়ে দেখতে পারি। ট্রল যেহেতু করছেন তারমানে ধরে নেয়া যায় বস্তির জীবন মান সম্পর্কে কমবেশি আপনাদের সবার ধারণা আছে। সাধারণত ছোট ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে একটা রুমের সমান জায়গা নিয়ে তার মধ্যে পরিবারের সবাই সকল জিনিসপত্র নিয়ে একসাথে থাকার জীবনের নাম বলা যায় বস্তির জীবন। সেই হিসেবে নিজের ফ্লাট ছাড়া সাবলেট জীবন যারা পালন করে ভেবে দেখুন তাদের মধ্যে পরিবেশগত পার্থক্য আসলে কতটুকু আছে? এটাচ বাথ আর ব্যালকনির সুবিধা নিয়ে একটা রুমের মধ্যে হল ছাড়ার পর আমার ঢাকার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে। প্রথমে কিছুদিন রুম শেয়ার করতে হয়েছে অন্যদের সাথে, সে আলোচনা ও এই যাত্রায় তুলে রাখি। অবশ্য প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য রোকেয়া হলে থাকতেও রুম শেয়ার করেছি আরো সাত জনের সাথে। সেখানেও সেনিটেশনের জন্য একটা ফ্লোরে ১০০টার বেশি মেয়ের জন্য বস্তিবাসীদের মতো ৬/৮ টা গন ওয়াশরুমের ব্যাবস্থা ছিল। একপাশে চারটা টয়লেটের একটার সুয়ারেজ লাইন থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝড়ত সবসময়। সকালে ক্লাশের সময় বাকি টয়লেটগুলোতে অন্য কেউ থাকলে অন্য ফ্লোরে দৌড়াতে হতো নয়তো সুয়ারেজ লাইনের পানি গায়ে মেখে প্রাতঃকর্ম সারতে হতো। বহুবার আবেদন করেও মেরামত করা যায়নি। গোসলের জন্য বাথরুমের সামনে বালতি দিয়ে সিরিয়াল রেখে চেঁচিয়ে রুম নাম্বার বলে আসতাম যেন ভিতরের জন গোসল শেষে ডেকে দেয়, নয়তো অন্য কেউ ঢুকে পড়বে। আমার ধারণা ঢাকার আগের দিনের বিল্ডিংগুলোতে যেখানে রুমের তুলনায় বাথরুমের সংখ্যা তুলনামুলক কম আর পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি তাদের ও কমবেশি টয়লেটে সিরিয়াল দেয়ার এমন অভিজ্ঞতা আছে। মেসে থাকার অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা তাদের ব্যাপারটা আরো ভালো বলতে পারবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গনরুমের হলগুলো এখনো পত্রিকার শিরোনাম হয়ে ওঠে আবাসন ব্যাবস্থার অব্যবস্থাপনা ও দুর্দশার জন্য। যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারা বলতে পারবেন এখানে জীবন যাপনের মানের সাথে পার্থক্য খুব বেশি হবার কথা না। আমি আমার জেলজীবনের সাথে হুবহু মিল পাই।প্রাইভেসির প্রশ্নে ঢাকার শহরে বস্তির বেড়ার ফাঁকা আর ফ্লাটের জানালার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য আছে বলে আমার মনে হয় না। বেডরুমের দৃশ্য দুভাবেই চোখে পড়বে। আর যদি বলেন বস্তির অশিক্ষিত মহিলারা অশ্লীল গালিগালাজ করে, বস্তির পরিবেশ বাচ্চাদের ভবিষ্যত ও মেন্টাল হেলথের জন্য জন্য ক্ষতিকর, তাহলে বলব সংসদের দিকে তাকাতে সেখানে ওখানকার অজস্র ডিগ্রীধারী সর্দারনী কিভাবে অবলীলায় মিথ্যে বলে আর খিস্তি খেউর করে। আর বাকিরা উৎসাহের সাথে শুনে যায় আর আপনারা গাঁটের পয়সা খরচ করে সেখান থেকে রস্বাদন করেন। বস্তির বাচ্চারা যেমন সার্ভাইভ করতে শিখে যায় এই সর্দারনীর জঘন্য শাসনের বিপরীতে আমরাও ঠিক সেভাবেই টিকে আছি।
সত্যি বলতে ঢাকার শহরে বস্তির মধ্যে আমি কোন মৌলিক পার্থক্য দেখিনা। বলতে পারেন একটা আপনাদের ভাষায় অধুনা ফ্লাট কনসেপ্ট হতে পারে ভদ্র বস্তি অপরটা অভদ্র বস্তি। দুটোর মধ্যকার পার্থক্যগুলো আসেন এবার দেখি। একটু ভদ্রোচিত বস্তিতে থাকা মানুষগুলোর সবার গাড়ি নাই, তাই লোকাল বাসে চড়তে না চাইলে অভদ্র বস্তিপাড়ার লোকজন এগিয়ে আসে রিকশা আর সিএনজি নিয়ে। ঢাকার শহরে আলোচিত বস্তিতে থাকা বেশিরভাগ লোকজনের রিকশা হয়ে ওঠে আমাদের মতো ভদ্রবস্তিবাসীর গাড়ির বিকল্প নিরাপদ, সহজ আর সাশ্রয়ী বাহন। বসুন্ধরা সিটি আর যমুনা ফিউচার পার্ক হয়ে যায় ফুটপাথে থাকা শপিং সেন্টারগুলো। দিনশেষে একবার না হলেও বছরের মধ্যে অনেকগুলো দিন ওটাই আমাদের অনেকের শপিং সেন্টার। স্বপ্ন আর আগোরার মাছ মাংস বা সবজির বিকল্প করে বাসার পাশের ভ্যানের দোকানের অপেক্ষায় থাকি কোন না কোন সময়। কখনো ভেবে দেখেছেন অভদ্র বস্তিবাসীদের এই সেবাটুকু না থাকলে আপনি বা আমি কোথায় যেতাম?আর হ্যাঁ নিশ্চয়ই জানা আছে দেশের সবচেয়ে বড় রেমিটেন্স সোর্সের যোগানদাতারাও পোশাক কারখানায় কাজ করতে যায় এই অভদ্র বস্তিপাড়া থেকে, যাদের টাকায় গড়ে তোলা হয় আপনার আমার অফিসের ঘুষের যোগান আর থাকার মতো ভদ্র পাড়ার বস্তি কিংবা বিদেশের সেকেন্ড হোম, যেটা ওদের জীবনে কখনোই আসেনা। জাতীয় অর্থনীতির কথা বাদ দিলেও এই বস্তিবাসীরা আপনাকে বা আমাকে যে সেবাগুলোর বিনিময়ে ভদ্রপাড়ার বস্তিতে থাকার সুযোগ করে দিল, তাদের জন্য আপনার বা আমার অবদান কতটুকু?
বাঁচার জন্য নূন্যতম মৌলিক অধিকার, নাগরিক সুবিধা ও শিক্ষার আলো বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর প্রতি আপনাদের উপহাস দেখে মনে সত্যি ই প্রশ্ন জাগে শিক্ষার অভাব আসলে কার?